পূজিত শ্রীপট্ পরিবর্ত্তন●
শ্রীশ্রীরামঠাকুর প্রসঙ্গে
¤ ¤ ¤ ¤ ¤ ¤ ¤
মৃণাল মজুমদার
গৃহে পূজিত শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীপট্ বিশেষ কোন কারণে পরিবর্ত্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। পূজিত শ্রীপট্ পরিবর্ত্তন করার সময় কি কি করণীয় তা শ্রীশ্রীঠাকুর স্বয়ং বিশদে নির্দ্দেশ দিয়ে গিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে শ্রীধাম কৈবল্যধাম, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম আশ্রমের শ্রীমন্দিরে শ্রীপট্ পরিবর্ত্তন এবং শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ-পট প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত শ্রীশ্রীঠাকুরের পরমভক্ত অন্যতম পার্ষদ শ্রীযুক্ত সদানন্দ চক্রবর্ত্তী মহাশয়ের একখানি গ্রন্থ থেকে এখানে উল্লিখিত হল। - - - -
মৃনাল
- - - - ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ। শ্রীশ্রীঠাকুর চট্টগ্রামে শ্রীযুক্ত প্রসন্ন গুপ্ত মহাশয়ের গৃহে শুভবিজয় করিতেছেন। শ্রীধাম প্রতিষ্ঠার দিন নিকটবর্ত্তী হইতেছে। শ্রদ্ধেয় অখিল রায় মহাশয় ঠাকুর মহাশয়ের নিকট জানতে চাইলেন, শ্রীধামে কোন দেবতার মূর্ত্তি স্থাপন করা হইবে। অখিলদার কথা শুনিয়া ঠাকুর বলিলেন, "গৌর-নিতাই রাখতে পারেন, রাধাকৃষ্ণ রাখতে পারেন, শিব রাখতে পারেন, কালী রাখতে পারেন।"
সদানন্দদা বলিলেন যে সেইদিন প্রসন্ন গুপ্তের গৃহে কতিপয় ঠাকুর আশ্রিত ভক্তদের মধ্যে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। বয়স্ক ভক্তদের মাঝে তরুণ সদানন্দ অনতিদূরে বসিয়া শ্রীধাম আশ্রমে মূর্ত্তি স্থাপন প্রসঙ্গে ঠাকুর মহাশয়ের উক্তিগুলি শুনিবার পরে অখিলদাকে বলিতে শুনিয়াছিলেন, "ঠাকুর মশায়, আমরা আপনার শ্রীপট্ বসাইতে চাই।" অখিলদার এই কথার উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর কহিলেন, "আপনেরা কইলেতো হইবো না, সকলের মত নিয়া বসান।"
শ্রীপট্ প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি স্বরূপ শ্রীশ্রীঠাকুরের এমন উক্তি শুনিবার পরে উপস্থিত গণ্যমান্য সকলেই পরমানন্দ বোধ করিলেন। তাঁহারা অনুমানে বুঝিলেন ঠাকুরের শ্রীপট্ প্রতিষ্ঠায় তাঁহার অনিচ্ছা কিছু নাই।
এই রূপে মহাধুমধামের সহিত শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম আশ্রম প্রতিষ্ঠা দিবসে সকলের পছন্দ মত মনমোহনদার প্রথম তোলা শ্রীশ্রীঠাকুরের ঊর্দ্ধনেত্র ধ্যানস্থ ছবিখানা প্রতিষ্ঠিত হইল। তৎপর প্রতিদিন তাহাই পূজিত হইয়া আসিতেছিল।
১৯৩১ খৃষ্টাব্দ। ফাল্গুন মাস। দোল পূর্ণিমার পূর্বে চট্টগ্রামে শ্রীযুক্ত বিধুভূষণ মহাশয়ের গৃহে শ্রীশ্রীঠাকুর সর্ব্ব সমক্ষে প্রকাশ করিলেন যে তিনি শ্রীধাম আশ্রমে তিনরাত্রি বাস করিবেন। আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রায় আট মাস পরে চট্টগ্রামে পাহাড়তলী শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম আশ্রমে পতিত পাবন ঠাকুর শ্রীরামচন্দ্রদেব মাত্র তিন রাত্রি বাস করিয়াছিলেন। ইহার পর শ্রীরামঠাকুর মহাশয় আর কোনদিন শ্রীদেহে আশ্রমে প্রবেশ করেন নাই। কেহ অনুরোধ করিলে ঠাকুর মহাশয়ের সেই বিখ্যাত উক্তি, - "আমার ত কোন আশ্রম নাই, আপনাদের গৃহই আমার আশ্রম, আশ্রম বাসে গুরুর আজ্ঞা নাই।" যথাসময়ে দোল পূর্ণিমা উৎসবে কৈবল্যধামে শ্রীদেহে শ্রীশ্রাঠাকুরের শুভাগমন ঘটিল। শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ দর্শন করিতে ঠাকুর মহাশয় শ্রীমন্দিরে প্রবেশ করিলেন। পূর্ব্ব প্রতিষ্ঠিত শ্রীপট্ দর্শন করিয়াই ঠাকুর মহাশয় বলিয়া উঠিলেন, "ইনি তো নির্ব্বংশীয়া মূর্ত্তি। এই মূর্ত্তির পূজা হয় না।" শ্রীশ্রীঠাকুরের এবম্বিধ উক্তি শুনিয়া ভক্তদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠিল। এখন উপায় ? ফটোগ্রাফার শ্রদ্ধেয় মনমোহন পাইন মহাশয়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁহার নিকট বর্তমান কৈবল্যপট্ সম্বন্ধে ঠাকুরের গুরুদেবের পছন্দ হওয়ার কথা বিস্তারিত ভাবে শুনিয়া সকল ভক্তগণ স্থির করিলেন, পরমগুরুর পছন্দের ছবি কৈবল্যনাথের পট্ বসান হইবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠিল পূজিত পটের স্থানে অন্য পট্ স্থাপন করা কি উচিত হইবে? সকল সংঙ্কট মোচন কর্ত্তা যিনি, তিনি যখন স্বয়ং উপস্থিত, তখন ভাবনার কি আছে। সুতরাং পূজিত পটের স্থানে অন্য পট্ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপায় জানিতে চাহিলে ঠাকুর মহাশয় পট্ পরিবর্ত্তন কিরূপে করিতে হয় তাহা বিশদে বলিয়া দিলেন। তাহাতে কাহারও বুঝিতে অসুবিধা হইল না যে শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথের পট্ স্থাপনে ঠাকুরেরও সম্মতি আছে।
এইবার পট্ পরিবর্ত্তন কিরূপে করা হয় -- শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দ্দেশিত বিবরণ ছিল এইরূপ -- প্রথমে পূর্বের পূজিত শ্রীপট্ অর্থাৎ যে পট্ এতদিন পূজিত হইতেছিল তাঁহানকে নিত্য পূজা যে নিয়মে হইয়া আসিতেছিল সেইরূপ যথযথ ভাবে পূজা করিতে হইবে। তৎপরে পুষ্প পাত্র, কোশাকুশী, তাম্রকুন্ড ইত্যাদি ধুইয়া মুছিয়া এবং পূজার স্থান পরিস্কার করিয়া পুনরায় পূজার আয়োজন করিতে হইবে। এই বার প্রথম শ্রীপটের উপর দ্বিতীয় শ্রীপট্ অর্থাৎ যাঁহানকে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে তাঁহানকে এমন ভাবে রাখিতে হইবে যাহাতে পূর্বের শ্রীপটখানা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়িয়া যায়। এইবার পূজারীকে করজোড়ে প্রার্থনা করিতে হইবে এই বলিয়া - " আপনি কৃপা করিয়া এই শ্রীপটে প্রকাশিত হউন।"
প্রার্থনা অন্তে পূর্বের পূজার ন্যায় পুনরায় যথাযথ পূজা সম্পন্ন করিয়া প্রথম অর্থাৎ পশ্চাতের পট্ খানা পার্শ্ব দিয়া ধীরে ধীরে টানিয়া বাহির করিয়া দেওয়ালে টাঙ্গাইয়া রাখিতে হইবে। বলাবাহুল্য কোনরূপ অসুবিধা না হইলে, শঙ্খ,কাঁসর ঘন্টা বাদ্য এবং বারে বারে হরিধ্বনি উলুধ্বনি করা বিধেয়। কীর্ত্তন হইলে তাহাও চালাইয়া যাইতে হইবে।
এই রূপে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী শ্রীকৈবল্যধাম আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কয়েকমাস পরে শ্রীধামে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপস্থিতির মধ্যে উপরিউক্ত নিয়মে মহাধুমধামের সহিত প্রথম শ্রীপটের স্থানে বর্ত্তমান শ্রীকৈবল্যনাথের শ্রীপট্ প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হইয়াছিল। সেই হইতে শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম আশ্রমে শ্রীকৈবল্যনাথের শ্রীপট্ অদ্যাপিও পূজিত হইয়া আসিতেছেন।
জয় রাম
¤ ¤ ¤ ¤ ¤ ¤ ¤
'ছন্নাবতার শ্রীশ্রীরামঠাকুর'
শ্রীসদানন্দ চক্রব্ত্তী,
( পৃ ৬০, ৬১, ৬২ )
No comments:
Post a Comment